তর্পন

পিছনে মাল্যশোভিত দিব্য ত্রয়ীর ছবি। মঞ্চ আলো করে বসে আছেন অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রাক্তন শিক্ষক মদনমোহন আচার্য্য, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বামী ইষ্টেশানন্দ, প্রাক্তনীর সভাপতি শরদ কুমার মিযানী ও সম্পাদক শিবাজী বসু রায়। মঞ্চের সামনে বাঁ দিক ঘেঁষে মাল্যশোভিত দুটি ছবি। সদ্য প্রয়াত দুই শিক্ষকের। বাংলার কালীপদ মন্ডল। পদার্থ বিজ্ঞানের নারায়ণ চন্দ্র দাস। ওঁদের স্মৃতিচারণ ই ছিল অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। দর্শকাসনে উপবিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক, বর্তমান শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্মী এবং প্রাক্তনীর সদস্যেরা।
দিনটা ছিল শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬। ২০২৬ সালের প্রাক্তনী দের ‘গ্রীষ্মকালীন ফিরে আসা’ (রিট্রিট) কর্মসূচি শুরু হল ঠিক এই ভাবেই।

সাম্প্রতিক যে সব প্রাক্তনী চিরতরে বিদায় নিয়েছেন তাঁদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালনের পরে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান।

বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করার রেওয়াজ আছে নরেন্দ্রপুরে। এদিনের অনুষ্ঠানে সেই মন্ত্রোচ্চারণ করলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহারাজ স্বয়ং।

মূল অনুষ্ঠানের আগে বিদ্যালয় প্রাক্তনীর তরফে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে দুর্দান্ত সাফল্যের প্রধান কারিগর প্রধান শিক্ষক মহাশয়কে বিদ্যালয় প্রাক্তনী র তরফে সম্মানিত করা হয়।

পুষ্পস্তবক, একটি চারা গাছ, মিষ্টি ও একটি কলম প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন নরেন্দ্রপুরের পরিচালন কমিটির সদস্য প্রশান্ত গিরি, সহ সভাপতি সুনীল বরণ পট্টনায়ক। কালীপদ দার কনিষ্ঠ পুত্র আমাদের বিদ্যালয় প্রাক্তনীর সদস্য সৌরভ। শিক্ষক ও ছাত্রদের এক পুনর্মিলন হয়ে উঠেছিল এদিনের মধ্যাহ্ন। প্রথা মেনে স্বাগত ভাষণ দেন প্রাক্তনীর সভাপতি শরদ কুমার মিরানী। নারায়ণ দা দের মতো তিনিও একজন আশ্রমিক। কী ভাবে কালীপদ দা এবং নারায়ণ দা তাকে আশ্রমিক জীবনের সঙ্গে সংপৃক্ত করে তুলেছিলেন সেটা বলার সময় গলা ধরে আসছিল তাঁর।

স্মৃতিচারণের সূত্রটা রচনা করে দেন সভাপতি মদন দা। কালীপদ দা এবং নারায়ণদার সমসাময়িক মদনদা পরপর কয়েকটি ঘটনার মালা সাজিয়ে তাঁর সঙ্গে আমাদের দুই প্রয়াত শিক্ষকের ৬০ বছরের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে কী ভাবে কালীপদ দার অভিভাবকত্বে তাঁরা স্কুলটিকে সর্বাঙ্গ সুন্দর করে তোলার প্রয়াস নিয়েছিলেন সেই গল্প শোনান। নারায়ণদার শেষ বিদায়ের দিনের চিত্রটি তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, নারায়ণ দা আমরাও। আসছি পিছনে পিছনে। তখন দেখা হবে। কথা হবে।’ প্রত্যেকের চোখে তখন জল।

নরেন্দ্রপুর আশ্রমের বর্তমান সভাপতি প্রশান্ত দা নারায়ণ দা কে ভালোবেসে নাড়ু বলে ডাকতেন।‌ নরেন্দ্রপুরের খেলার মাঠের ইতিহাস লিখতে গেলে যে ত্রি- মূর্তির নাম করতেই হয় তাঁদের মধ্যে প্রশান্ত দা ছিলেন বয়োঃজৈষ্ঠ। তাঁর ডান হাত-বাঁ হাত ছিলেন নারায়ণ দা এবং বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র অরুণ দাস। অরুণ দাস প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছু বছর আগে। এবার চলে গেলেন নারায়ণ দা।
বয়সে বড় কালীপদ মন্ডল প্রশান্ত দার সহপাঠী ছিলেন। ‘তবুও আমি ওঁকে নাম ধরেই ডাকতাম। কখনও সখনও আমাকে বলত ‘তুমি আমার থেকে অনেক ছোটো। নাম ধরে কেন ডাকো?’ বুঝতাম ওটা ভালোবাসার লক্ষণ’, মন্তব্য প্রশান্ত দার।
কালীপদ দা আর নারায়ণ দা কে খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে হারিয়ে বেশ বিহ্বল লাগছিল প্রশান্ত দা কে। তিনি বলেন, ‘ওঁদের দু’জন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওঁদের আসল পরিচয় ওঁরা আশ্রমিক। এই প্রতিষ্ঠানের কষ্টের দিনে প্রতিকূলতার সামনে বুক পেতে দেওয়া সৈনিক।’

বিদ্যালয়ের ১৯৭০ ব্যাচের প্রাক্তনী চিন্ময় ঘোষের কাছে খালিদ দা যেন তাঁর আবাসিক জীবনের প্রথম অবিভাবক। চিন্ময় দা বলেন, ‘১৯৬৪ সালে ঘটনা থেকে যখন নরেন্দ্রপুরে পড়তে আসি ভবনের প্রথম ওয়ার্ডেন ছিলেন কালীপদ দা। লোক্যাল গার্জেন। ‘ সেই সম্পর্ক টাই তাঁর মনের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে। নারায়ণদার কাছে পদার্থ বিজ্ঞানের পাঠ পাওয়াটাও তাঁর জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি বলেও জানালেন চিন্ময় দা।

৯৯৬৮ সালের প্রাক্তনী তুষার গুণ নিজে ছিলেন কলকাতার প্রথম ডিভিশনের নিয়মিত ফুটবলার। নারায়ণ দা কে তিনি তাঁর খেলোয়াড় জীবনের পথপ্রদর্শক বলে বর্ণনা করেন। ১৯৬৭ সালের প্রাক্তনী দিলীপ মিরানী, ১৯৭২ সালের প্রাক্তনী তপন মুখোপাধ্যায় এবং ১৯৭৩ সালের প্রাক্তনী সূর্য সারথী বরাট তাঁদের সময়কার নরেন্দ্রপুরের জীবন এবং তার সঙ্গে কালীপদ দা এবং নারায়ণ দা কী ভাবে জড়িয়ে ছিলেন তার বিবরণ দেন।

১৯৭৫ সালের প্রাক্তনী দেবদূত ঘোষঠাকুর ‘স্বামী লোকেশ্বরানন্দ স্মৃতি সঙ্কলন এবং বিদ্যালয়ের ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’ সংখ্যার সম্পাদনার কাজে মুখ্য সম্পাদক কালীপদ দা কে সাহায্য করতে গিয়ে তাঁর পান্ডিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। আর নারায়ণ দার সঙ্গে এনসিসির এয়ার উইংসের দিনগুলির স্মৃতি চারণ করেন। বলেন, ‘নারায়ণ দা ছিলেন এয়ার উইংসের সর্বাধিনায়ক। শৃঙ্খলা আর দেশাত্মবোধের ভাবনায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।’ খেলার মাঠের বন্ধু হিসেবে নারায়ণ দাকে বর্ণনা করে বক্তা বলেন, ‘বুট কিনতে না পেরে যাঁরা স্কুল টিমের ট্রায়ালে সুযোগ পেত না, তাঁদের কাছে নারায়ণ দা ছিলেন কোচ কাম ম্যানেজার।’

বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বাংলার শিক্ষক অলোক দত্ত কালীপদ দা কে নিজের গুরু হিসেবে মেনে নিতে মনে কোনও দ্বিধা রাখেননি। অশোকবাবু বলেন, ‘আমি যখন শিক্ষক হিসেবে নরেন্দ্রপুরে যোগ দিই তখন কালীপদ দা বাংলা বিভাগের প্রধান। হাতে ধরে কাজ শিখিয়ে গিয়েছেন।’

গুরু নারায়ণ দার অন্তিম সময়ে প্রকৃত শিষ্য র ভূমিকা পালন করেছিলেন বিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক সুগত রঞ্জন সাহা। গুরুর অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফিরেছিলেন শিষ্য। অমায়িক, ছাত্র দরদী মানুষটি যে ভাবে তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনান সুগত বাবু।‌

অনুষ্ঠানের ইতি টানেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বামী ইষ্টেশানন্দ। বিদ্যালয়ের কাজে যুক্ত হওয়া ইস্তক যে ভাবে প্রয়াত দুই শিক্ষক তাঁকে সাহায্য করেছেন তার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘গুরু শিষ্য পরম্পরার যে ধারা নরেন্দ্রপুর ধারণ করছে তা অনন্য। এই জন্যই আমরা সবার থেকে আলাদা। বিদ্যালয়ের নতুন প্রজন্মের শিক্ষকেরা সেই টানেই আজ এখানে এসেছেন।’ গর্বের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ভ্রাতৃত্বের যে বীজ উত্তর সুরীরা বুনে দিয়ে গিয়েছেন, সেই বৃক্ষ এখন মহিরুহ। এখানে নতুন পুরাতনের কোনো দ্বন্দ্ব নেই, সরকারি শিক্ষক -আশ্রম নিযুক্ত শিক্ষকের কোনও ভেদাভেদি নেই। তাই আমরা এগিয়েই চলেছি।’

সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রাক্তনী র সম্পাদক শিবাজী বসু রায়। তিনি ঘোষণা করেন, ‘প্রয়াত হওয়া শিক্ষক দের প্রতি এই স্মৃতি তর্পন এবার থেকে প্রাক্তনী র দায়িত্ব থাকল।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + thirteen =

Main Menu